• ঢাকা
  • বৃহঃস্পতিবার , ৩০ জুলাই ২০২৬ , রাত ০২:১৬
ব্রেকিং নিউজ
হোম / জাতীয়
রিপোর্টার : বিশেষ প্রতিবেদক:
কর্পোরেট গ্রুপে বাড়ছে ভ্যাট দুর্বৃত্তায়ন, রেয়াতের অপব্যবহার

কর্পোরেট গ্রুপে বাড়ছে ভ্যাট দুর্বৃত্তায়ন, রেয়াতের অপব্যবহার

প্রিন্ট ভিউ

বাংলাদেশে রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম বড় কারণ ভ্যাট দুর্বৃত্তায়ন, ভ্যাট রেয়াতের অপব্যবহার। সরকার ব্যবসা সহজীকরণ ও দ্বৈত কর এড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট রেয়াত সুবিধা দিয়ে থাকে। শুধু খুচরা পর্যায়ে নয়, বড় কর্পোরেট গ্রুপে ভ্যাট রেয়াত ও ফাঁকির কারণে সরকারের রাজস্ব চাহিদা বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এনবিআর-এর তদন্তে বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম উঠে আসে, যা বাজেট ও উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই ব্যবস্থাকে অনেকে রাজস্ব ফাঁকির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভুয়া বিল-চালান, ইনপুট-আউটপুট হিসাব গরমিল এবং দ্বৈত সুবিধা নেওয়ার মতো অনিয়ম নিয়মিত ঘটছে। এতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিপুল পরিমাণ ভ্যাট আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

নানাভাবে হচ্ছে ভ্যাট রেয়াতের অপব্যবহার। ১. ভুয়া চালান তৈরি করে কাঁচামাল কিনেইনি, অথচ চালান দেখিয়ে রেয়াত গ্রহণ। ২. ইনপুট-আউটপুট গরমিল করে আসল উৎপাদন ও বিক্রির হিসাব না মিলিয়ে বেশি রেয়াত নেওয়া। ৩. রপ্তানিমুখী শিল্পে একদিকে শুল্ক ছাড় নেওয়া হয়, আবার ভ্যাট রেয়াত ও দাবি করে দ্বৈত সুবিধা নেয়। ৪. অনেক কর্পোরেট গ্রপ রয়েছে পণ্য বা কাঁচামাল আমদানীর সময় ভ্যাট রেয়াত পাওয়া পণ্যের সাথে অন্য ভ্যাটযুক্ত পণ্যও খালাস করে নেয়। ৫. অতিরিক্ত আমদানির কাগজপত্র দেখানো, কাঁচামাল আমদানি হিসেবে বেশি দেখিয়ে ইনপুট ভ্যাট দাবী করে। ৬. স্টকপাইলিং ও দাম পুনঃক্যালিব্রেশন ৭.  বাজেট ঘোষণার আগে পুরনো মূল্যে ভ্যাট হিসাব করে পরে বাড়তি মুনাফা দেখে সেটার কর না দেওয়া হয় ৮.  সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃত্রিম লেনদেন করে গোষ্ঠীভিত্তিক ভ্যাট ক্রেডিট স্থানান্তর করে ইনপুট ভ্যাট বাড়িয়ে দেখায়।

রেয়াতের অপব্যবহার কর্পোরেট গ্রুপগুলোয় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সাথে অসাধু কর্মকর্তাদের নিজেদের অনৈতিক সুবিধা নেওযার কারণে সরকারের বিরাট রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। দেশে কয়েকটি কর্পোরেট গ্রুপ যেমন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটন গ্রপকে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট রেয়াত পাওয়া প্রতিষ্ঠান বলা হচ্ছে। এদের বিশাল আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের কারণে ভ্যাট রেয়াত ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার সুযোগও তাদের সবচেয়ে বেশি।

যেসব ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান বা এমন প্রতিষ্ঠান ভ্যাট রেয়াত নিয়েছে, সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে রেয়াত নিয়েছে কেউকেউ। অন্যদিকে মনোপলি করে কেউ যেনো এধরনের শিল্প করতে না পারে বা সমকক্ষ কেউ না আসতে পারে এজন্য রেয়াত পাওয়া পণ্যে অন্যদের জন্য বেশি শূল্ক নির্ধারণ করে রেখেছে। কাজেই সব কিছু পূন: পর্যবেক্ষণ করে সময়ের প্রয়োজনের সাথে সমন্বয় করে রেয়াত নির্ধারণ করা উচিত।

অভিযোগ রয়েছে, অপ্রয়োজনীয় বা সামঞ্জস্যহীন পণ্যকে রেয়াত পণ্যে গণ্য করে বাজারজাত করা হচ্ছে। যেমন, কর্পোরেট গ্রপের কেউ প্লাস্টিকের টেবিল চেয়ার আসবাব বা অন্য সামগ্রী যা মানানসই নয় সেসব যদি এগ্রো প্রডাক্ট ধরে ভ্যাট রেয়াত নিয়ে থাকে যা মূলত ব্যবহার হয় অফিস আদালত এবং বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে। আবার প্লাস্টিক বা একই ধরনের যেসব মেটালিক সামগ্রী এগ্রো পণ্যের বা ভ্যাট এক্সামপসন পণ্যের আওতাভুক্ত সেগুলো সরাসরি আমদানী করেও ভ্যাট রেয়াত নেয় এবং নিজস্ব শোরুমে নিজেদের পণ্য হিসেবে বিক্রয় করে। এগুলো পর্যবেক্ষণ করে ভ্যাট ফাঁকি ধরার দায়িত্ব ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগের। 

উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে শিল্পায়ন করতে হবে। কিন্তু ছোটো ছোটো শিল্প কারখানার কাজ করছে বড় শিল্পসমৃদ্ধ কর্পোরেট গ্রুপ। এতে যেমন ভ্যাট ফাঁকি, কারচুপি কৌশল বাড়ছে তেমনি আদায়ে ভারসম্য হীনতা তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, আদায়ে স্বচ্ছতা না থাকা ও ফাকি বেড়ে যাওয়ায় ক্রমে বড় আকারে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ফলে ভ্যাটের হার বাড়ানো হচ্ছে। এতে সঠিকভাবে ভ্যাট দেওয়াদের উপর আরো চাপ পড়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঠিকভাবে ভ্যাট দেওয়ার সুযোগে তৈরি না হওয়ায় ন্যায্যভাবে ভ্যাট দেওয়াদেরও নিজেদের বাঁচাতে ফাঁকির পথ বেছে নিতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় গ্রুপগুলো অনেক সময় ইনভয়েসে হেরফের করে বা উৎপাদন-বিক্রির হিসাবের গরমিল দেখিয়ে অতিরিক্ত রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে কর ফাঁকি ধরা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন জটিল ও ব্যাপক। এনবিআর-এর ভ্যাট গোয়েন্দা ইউনিট বারবার সতর্ক করেছে যে ভ্যাট রেয়াত ব্যবস্থার অপব্যবহার না ঠেকাতে পারলে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে। বর্তমানে লক্ষ্য পূরণে ঘাটতি কয়েক হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার একটি বড় অংশ এ ধরনের ফাঁকি থেকে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভ্যাট ইনটেলিজেন্স পর্যায়ে করা তদন্তে দেখা যায় আমদানিকৃত পণ্যগুলো বাস্তবে উৎপাদন উপকরণ হিসেবে ব্যবহার না করে সরাসরি বিক্রি করে আয়ের অংশ লুকানোর অভিযোগ উঠেছিল; এনবিআর-এর অডিটে বিল্ডট্রেড গ্রুপের বিরুদ্ধে কয়েক কোটিরও বেশি অদায়ি বা ফাঁকির হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। এনবিআর ও ট্যাক্স ইনটেলিজেন্স ইউনিট সাম্প্রতিক সময়ে একত্রে বিভিন্ন সেক্টর থেকে দ্রুত তদন্ত-জরিপ চালিয়ে প্রায় কয়েকশ কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার অ্যাসোসিয়েটেড অনিয়ম উঠে এনেছে এবং কিছু অংশ আদায়ও করেছে। কিন্তু মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনি জটিলতা থেকে অনেক টাকার আদায় ‘আটকে’ পড়ে থাকে। 

ভ্যাট রেয়াত একটি ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা, কিন্তু এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে “রেয়াত” পরিণত হয় “ফাঁকিতে। ফাঁকি দেওয়া কর্পোরেট গ্রপে সরকার যদি স্বচ্ছ অডিট ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ভ্যাট রেয়াতের নামে রাজস্ব দুর্বৃত্তায়ন চলতেই থাকবে, আর বাড়তেই থাকবে জাতীয় রাজস্ব ঘাটতি।


জাতীয়

আরও পড়ুন