• ঢাকা
  • বুধবার , ২৭ মে ২০২৬ , রাত ১২:৩৭
ব্রেকিং নিউজ
হোম / মতামত
রিপোর্টার : সাকিফ শামীম
দক্ষিণ এশিয়ায় মেডিকেল ট্যুরিজমের নতুন প্রতিযোগিতা: স্বাস্থ্যখাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে ভাবার সময় এখনই

দক্ষিণ এশিয়ায় মেডিকেল ট্যুরিজমের নতুন প্রতিযোগিতা: স্বাস্থ্যখাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে ভাবার সময় এখনই

প্রিন্ট ভিউ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি নির্মম বাস্তবতা হলো প্রতি বছর দেশেরএক বিশাল সংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে পাড়ি জমানসাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা  অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ীবাংলাদেশথেকে প্রতি বছর প্রায়  লক্ষেরও বেশি মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্যযাযার প্রধান গন্তব্য থাকে প্রতিবেশী দেশ ভারতচীনথাইল্যান্ডসিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এবং বিভিন্নবাণিজ্যিক সংস্থার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়এই বহির্গামীরোগীদের পেছনে বছরে প্রায়  থেকে  বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়এই িপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে চলে যাওয়ার পেছনেকেবল উন্নত প্রযুক্তির অভাব দায়ী নয়বরং একটি সুসংগঠিত কাঠামোর পরিকল্পনার অভাবও দায়ী দীর্ঘকাল ধরে রোগীরা বিদেশেরহাসপাতালগুলোকে বেছে নিয়েছেন কারণ সেখানে দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তিকমরোগ নির্ণয়ের স্বচ্ছতা েশি এবং সেবার মান অত্যন্ত সুশৃঙ্খলএই দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তি এবং আর্থিক ক্ষতি বাংলাদেশের সাধারণমানুষের জন্য এক বড় বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়েছেযা অনেক সময়মধ্যবিত্ত  নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেয়

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে গত এক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঅবকাঠামোতে একটি বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে দেশেরবেসরকারি খাতের বড় বিনিয়োগকারীরা এখন আধুনিকমাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তুলছেনযা প্রযুক্তির দিক থেকেথাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের হাসপাতালগুলোর সাথে পাল্লা দিতে সক্ষমউন্নত হার্ট সার্জারিরোবটিক সার্জারিহাড়ের প্রতিস্থাপন এবং ক্যান্সারচিকিৎসার জন্য এখন অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি দেশের বড়হাসপাতালগুলোতে বিদ্যমান বর্তমান সময়ে ল্যাবএইডএভারকেয়ারকিংবা ইউনাইটেড-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বমানের যন্ত্রপাতি  দক্ষচিকিৎসক নিয়ে কাজ করছে কিন্তু অবকাঠামোগত এই উন্নয়ন সত্ত্বেওআস্থার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে রোগীরা যখন দেখেন যে দেশে সঠিকরোগ নির্ণয় করতে বারবার পরীক্ষা করাতে হচ্ছে বা চিকিৎসার চূড়ান্তফলাফলে অনিশ্চয়তা থাকছেতখনই তারা বিদেশে পাড়ি দেওয়ারসিদ্ধান্ত নেন এই মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হলে কেবল বড় ভবনবা যন্ত্রপাতির পেছনে বিনিয়োগ করলে চলবে নাবরং একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য

বাংলাদেশকে চিকিৎসা পর্যটনের একটি হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্যএবং দেশীয় রোগীদের বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে হলে আমাদের কৌশলগতপরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে প্রথমতআমাদেরহাসপাতালগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি বা জেসিআই (Joint Commission International) অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনে মনোযোগী হতেহবে বর্তমানে বাংলাদেশে এই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাসপাতালের সংখ্যা অত্যন্তসীমিত (ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতালইউনাইটেড হাসপাতাল এবংএভারকেয়ার), যেখানে ভারত বা থাইল্যান্ডে এর সংখ্যা অনেক বেশিএই স্বীকৃতি কেবল একটি সার্টিফিকেট নয়এটি বিশ্বব্যাপী রোগীদেরকাছে একটি নিশ্চয়তা যে এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা আন্তর্জাতিকমান অনুসরণ করে দেওয়া হয় যখন আমাদের দেশীয় হাসপাতালগুলোএই মান অর্জন করবেতখন মধ্যবিত্ত  উচ্চবিত্ত রোগীরা দেশেইচিকিৎসার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন এছাড়া চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের গুণগত মান বা সফট স্কিলস উন্নত করাপ্রয়োজন কারণ অনেক সময় দেখা যায়রোগীরা চিকিৎসকের কথা ব্যবহারেই অর্ধেক সুস্থ হয়ে ঠেনযা আমাদের দেশে এখনো পুরোপুরিপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি

মেডিকেল ট্যুরিজমকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে হলে সরকারকে একটিবিশেষায়িত ‘মেডিকেল ট্যুরিজম টাস্কফোর্স’ গঠন করতে হবে এইটাস্কফোর্সের কাজ হবে বিদেশের রোগীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজকরাবিশেষ করে ক্ষিণ এশীয়  মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যেনরোগীরা সহজে আসতে পারেন তার জন্য ‘হেলথ ভিসা’ ব্যবস্থা চালুকরা তবে এটি করার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদেরদেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সেবা মজুদ আছে বিদেশি রোগীদেরআকর্ষণ করার আগে আমাদের অভ্যন্তরীণ রোগীদে সন্তুষ্টি অর্জনকরতে হবে রেফারেন্স হিসেবে যদি আমরা ভারতের চেন্নাই বা দিল্লিরহাসপাতালগুলোর দিকে তাকাইতবে দেখা যাবে তারা কেবল চিকিৎসারজন্য বিখ্যাত নয়বরং তাদের প্যাকেজগুলোতে যাতায়াতথাকা এবংঅনুবাদক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে বাংলাদেশ যদি তারহাসপাতালগুলোতে এই ধরনের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পেশেন্ট কনসিয়ার্জসার্ভিস’ চালু করতে পারেযেখানে বিমানবন্দর থেকে রোগী গ্রহণ করেসরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের ভাষা বোঝার জন্যদোভাষী থাকবেতবেই বিশ্ববাজারে আমরা একটি শক্ত প্রতিযোগীহিসেবে দাঁড়াতে পারব

উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে দেশের চিকিৎসা সেবাকে আরও নিখুঁত করারসুযোগ রয়েছে বিশেষ করে ক্যান্সার এবং জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রেবাংলাদেশ যদি গবেষণানির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি বা প্রিসিশন মেডিসিনেরওপর জোর দেয়তবে রোগীরা বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেননা বর্তমানে আমাদের দেশে বায়োটেকনোলজি  ন্যানোটেকনোলজিব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের যে প্র্যাকটিস তৈরি হয়েছেতাকে কাজেলাগিয়ে ল্যাবরেটরি টেস্টের মান আরও নির্ভুল করতে হবে যখন দেশেরপ্যাথলজি রিপোর্টগুলো বিদেশের বড় হাসপাতালগুলো সরাসরি গ্রহণকরবেতখনই বোঝা যাবে আমাদের রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকমানে পৌঁছেছে এই মানদণ্ড অর্জন করলে রোগীরা কেবল আস্থারসাথেই দেশে চিকিৎসা নেবেন নাবরং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সময় অর্থ উভয়েই সাশ্রয় হবে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটিনতুন আশীর্বাদ হয়ে আসবে কারণ তখন চিকিৎসা খাত থেকে আমরাবিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারব এবং ধীরে ধীরে বিদেশি মুদ্রাঅর্জনও শুরু হবে

মেডিকেল ট্যুরিজম সেক্টরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে বেসরকারিহাসপাতালের ওপর সরকারের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ  তদারকি থাকতেহবে যেন খরচের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় প্রাইভেট হাসপাতাল এবংপাবলিক সেক্টরের মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতেহবে সরকার যদি চিকিৎসা গবেষণায় বিশেষ কর সুবিধা বা ভর্তুকিপ্রদান করে এবং হাসপাতালগুলো যদি উন্নত প্রযুক্তির সাথে মানবিকসেবার সমন্বয় ঘটাতে পারেতবেই বাংলাদেশের চিকিৎসা পর্যটন খাতঅর্থনীতি  আস্থার নতুন দিগন্ত স্পর্শ করতে পারবে আমাদের লক্ষ্যহতে হবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে কোনো রোগীকেচিকিৎসার জন্য পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বিমানে উঠতে হবে নাবরং বিদেশথেকেই রোগীরা বাংলাদেশে আসবেন সেবা নিতে এই লক্ষ্য অর্জনেসঠিক নীতিমালাআধুনিক প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগ এবং সর্বোচ্চ নৈতিকচিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের আগামীর প্রধান কৌশলআস্থার এই সংকট দূর করতে পারলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দেশেরগণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

সাকিফ শামীম (অর্থনীতিবিদ), 

ম্যানেজিং ডিরেক্টরল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপারস্পেশালিটি সেন্টার

ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরল্যাবএইড গ্রুপ

মতামত

আরও পড়ুন